শুবাচকে একুশে পদক দেওয়া সময়ের দাবি / রিপন কুমার বণিক
শুবাচকে একুশে পদক দেওয়া সময়ের দাবি
‘শুদ্ধ বানান শুদ্ধ ভাষা, বাংলা আমার ভালোবাসা’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে শুবাচ (শুদ্ধ বানান চর্চা) নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ গড়ে উঠে। এই গ্রুপটি গত কয়েক বছর ধরে দেশ-বিদেশের বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে যাদের শুদ্ধ বানান চর্চার স্পৃহা রয়েছে এমন একটি শ্রেণিকে একই প্লাটফর্মে সমবেত করতে সক্ষম হয়েছে। শুদ্ধ বানান নির্ণয়, শব্দের সঠিক অর্থ জানা এবং সঠিক ভাষা রীতি জানতে শুবাচের সঙ্গে যুক্ত থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বাংলা ভাষাকে মর্যাদা দিচ্ছে। আর যিনি এই অবারিত সুযোগটি সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং শত ব্যস্ততার মাঝেও গ্রুপে সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন তিনি একজন লেখক এবং বাংলাদেশ সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. মোহাম্মদ আমিন। তিনিই শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) এর পৃষ্ঠপোষক ও অ্যাডমিন।অতি প্রয়োজনীয় কয়েকটি লিংক
তিনি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যচর্চা ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। ফেসবুক গ্রুপ শুবাচ সৃষ্টির শুরুতে তিনি নিজে বিভিন্ন পোস্ট অনুমোদন ও পোস্টের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞ আরও কয়েকজন এ কর্মযজ্ঞে নিরলসভাবে যুক্ত থেকে শুদ্ধ বানান চর্চা ও বাংলা বানানের ক্ষেত্রে প্রমিত নিয়ম প্রয়োগের দিক নির্দেশনা প্রদানের মধ্য দিয়ে সহযোগিতা করে চলেছেন।
পোস্টার, ব্যানার, বিলবোর্ড, ফেস্টুন, সাইনবোর্ড সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের চিঠি ও নথিপত্র এমনকি গণমাধ্যম জুড়ে রয়েছে ভুল ও অশুদ্ধ বানানের ব্যবহার। যা রোধ করা কারোর পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। সাম্প্রতিককালে সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা বাংলায় স্ট্যাটাস লিখে থাকেন তাদের মধ্যেও অনেক বিশিষ্টজন রয়েছেন যারা সঠিক বানান রীতি না জেনে ত্রুটিপূর্ণ বাক্য লিখে থাকেন। তাতে তাঁদের ব্যক্তিত্বহানি ঘটে বলে সমাজে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। আর তা থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একে অপরের মাধ্যমে শুবাচের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আর শুবাচ গ্রুপে গিয়ে নিজের শব্দগত অসঙ্গতি তুলে ধরে শুদ্ধ শব্দ ও বাক্যের সমাধান পাচ্ছেন। এভাবেই এই গ্রুপে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে সদস্য সংখ্যা। গ্রুপের সদস্যদের মধ্য থেকে শুদ্ধ বানান ও শুদ্ধ ভাষারীতিতে পারদর্শী সদস্যরা প্রতিটি পোস্টের বিজ্ঞ ও জ্ঞানগর্ভ তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে কমেন্টস করছেন। তাতে কাঙ্খিত শুদ্ধ বানান ও ভাষা চর্চার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। শুবাচের মতো অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এতটা সফল ভূমিকা রাখতে পারছে না। বর্তমানে শুবাচ গ্রুপের পাশাপাশি রয়েছে শুবাচ ব্লগ। শুবাচকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গ্রুপের সদস্যদের মধ্য থেকে রয়েছে নানাবিধ প্রস্তাব। সোশ্যাল মিডিয়ার পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল এমনকি বিদেশেও রয়েছে শুবাচের অনেক সংগঠন। যা দিন দিন আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। এ সংগঠনগুলোতে নিয়মিতভাবে বাংলাভাষাকে শুদ্ধভাবে ব্যবহারের জন্যে সভা সেমিনারের আয়োজনও করা হয়ে থাকে।
গ্রুপের অনেক সদস্যই মোবাইল ফোন অথবা কম্পিউটারের মাধ্যমে শুবাচ গ্রুপে নতুন কোন পোস্ট রয়েছে কিনা তা দেখতে আগ্রহ নিয়ে একাধিকবার শুবাচে প্রবেশ করেন। আর সেই সংখ্যাটিও বর্তমানে কম নয়। ফলে দেখা যাচ্ছে পোস্টের আলোচনা পর্যালোচনায় প্রতিদিন নতুন অনেক কিছুই শেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা লেখালেখি, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা এবং শুদ্ধ বানান চর্চা ও বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা রয়েছে তারাই শুবাচকে আড্ডায় এবং আলোচনায় একে অপরের কাছে তুলে ধরছেন।
গ্রুপের অনেক সদস্যই শুবাচের পোস্টে অনেক আবেগপূর্ণ কথা লিখেছেন। তাদের মধ্যে মোহনগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রভাষক মোহাম্মদ হাফিজ উদ্দিন একটি পোস্টে লিখেছেন- শুবাচ যেন আমাদের কাছে সারা বছরটাকেই ফেব্রুয়ারি করে রাখে। রেজাউল করিম একটি পোস্টে লিখেছেন- শুবাচ হলো বাংলা ভাষার আয়না। ড. আব্দুর রহিম একটি পোস্টে লিখেছেন- সাইনবোর্ড/ ব্যানারসহ ছাপানো ফর্মে অশুদ্ধ বানান প্রকাশ করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত। হাসান সিদ্দিক একটি পোস্টে লিখেছেন- শেখার ক্ষেত্রে কোন লজ্জা নাই, লজ্জা আছে ভুল বানান ব্যবহার করার মধ্যে ।
এই গ্রুপের বর্ণনায় আছে- “শুদ্ধ বানান চর্চা ও বাংলা বানানে প্রমিত নিয়ম প্রয়োগে উৎসাহ প্রদান, বাংলা বানান ও শব্দচয়নে ভুল কিংবা যথেচ্ছাচার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসার ও সমৃদ্ধায়নের লক্ষ্যে আলোচনা-পর্যালোচনা, গবেষণা ও উপযুক্ত গ্রন্থাদি প্রকাশ এবং লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মিলিতভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এ গ্রুপের অন্যতম উদ্দেশ্য। দেশে-বিদেশে অবস্থানরত বাংলাভাষী ছাড়াও যে সকল বিদেশি বাংলা ভাষা শেখার জন্য আগ্রহী, গ্রুপের পক্ষ থেকে তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা প্রদান করা হবে।”
ভার্চুয়াল দুনিয়ায় দেশ-বিদেশের বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে শুদ্ধ বানান চর্চার দায়বদ্ধতা থেকে যে আন্দোলন ‘শুবাচ’ চালিয়ে যাচ্ছে সেই কর্মকাণ্ডকে একুশে পদক প্রদানের মধ্য দিয়ে এর পৃষ্ঠপোষক ও অ্যাডমিন ড. মোহাম্মদ আমিনকে অনুপ্রেরণা দেওয়া যেতে পারে।
————————————————-
Comments
Post a Comment